দুই বছর ধরে চলমান গাজায় হামলা এবং সাম্প্রতিক শান্তি আলোচনা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের অর্থনীতি এখনো ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ শেষ হলেও এ অবস্থা থেকে দ্রুত মুক্তি মিলবে না। কারণ স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া ফিলিস্তিনিরা অর্থনীতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। খবর দ্য ন্যাশনাল।
রামাল্লাহর আরব আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি ও অর্থায়ন বিভাগের অধ্যাপক নাসের মুফরেজ বলেন, ‘গাজায় যা ঘটছে বা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যে আলোচনা চলছে, তা ফিলিস্তিনের অর্থনীতিতে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না। ইসরায়েল আগের মতোই কঠোর নীতি চালিয়ে যাবে। অন্তত আগামী দুই-তিন মাসে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে ফিলিস্তিনের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায় শুরু হবে। এতে দেশটিতে বিনিয়োগ বাড়বে। যদি গাজায় যুদ্ধবিরতি ন্যায়সংগত ও স্থায়ী সমাধানের পথ খুলে দেয় এবং একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগ, খরচ ও ভোগ বাড়বে। এতে দাতা দেশগুলোর মধ্যেও নতুন আশাবাদ তৈরি হবে।’
প্যালেস্টাইন ইকোনমিক পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক রাজা খালিদি বলেন, ‘একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন অঞ্চলটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠতে পারে। পশ্চিম তীরে শিল্প, কৃষি, সেবা ও ব্যাংক খাতে যে মডেল তৈরি হয়েছে, তা আঞ্চলিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আলোচনা এখন সেখানেই পৌঁছানো উচিত। ২০০৩ সালেই এটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ইয়াসির আরাফাতের সময় একটি সংবিধানও প্রণয়ন করা হয়েছিল।’
বর্তমানে পণ্য চলাচল, শ্রম ও রাজস্ব সংগ্রহে বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে ইসরায়েল। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের রাজস্বও আটকে রেখেছে, যা সরকারি আয়ের বড় উৎস। ফিলিস্তিনে এখনো ইসরায়েলি মুদ্রা শেকেলই প্রধান মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার হয়।
ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সাবেক গভর্নর ফিরাস মেলহেম বলেন, ‘নতুন কোনো ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত পশ্চিম তীরে বর্তমান অবস্থা বজায় থাকবে। এর মানে হলো ইসরায়েলের আরোপিত বিধিনিষেধ চলবে। তারা ফিলিস্তিনের রাজস্ব আটকে রাখবে, ফলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে।’
ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা পুনর্গঠনের জন্য একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এতে গাজায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে, যা অন্যান্য দেশের সঙ্গে পছন্দনীয় শুল্ক ও বাণিজ্য সুবিধা পেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুর দিকে গাজায় অর্থনৈতিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির ছিল। গত বছর দেশটির জিডিপি বার্ষিক ভিত্তিতে ৮৩ শতাংশ কমেছে এবং চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি–মার্চ) আরো ১২ শতাংশ হ্রাস পায়।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের প্রতিবেদন অনুসারে, ইসরায়েলের আরোপিত অতিরিক্ত বিধিনিষেধের কারণে পশ্চিম তীরের অর্থনীতি ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গভীর সংকোচনের মুখে পড়েছে। ২০২৪ সালে অঞ্চলটির অর্থনীতি ১৭ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। মাথাপিছু জিডিপি কমেছে ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ। এতে ১৭ বছরের উন্নয়ন অগ্রগতি মুছে গেছে এবং অর্থনীতি ২০১৪ সালের পর্যায়ে নেমে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে পশ্চিম তীরের অর্থনীতি যদি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধের মুখে না পড়ত, তাহলে এ সময়ের মধ্যে মোট জিডিপি এখনকার তুলনায় ১ হাজার ৭০৮ কোটি ডলার বেশি হতে পারত। এটি পশ্চিম তীরের গত বছরের জিডিপির ১৭ গুণ।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আনাস ইকতাইত বলেন, ‘পশ্চিমা দেশগুলোর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রতীকী পদক্ষেপ ছাড়া কিছু নয়। ভূমির ওপর পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ছাড়া ফিলিস্তিন অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে পারবে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের পাওয়া রাজস্বের ৭০ শতাংশই ইসরায়েল থেকে সংগৃহীত আমদানি কর। স্থানীয় কর রাজস্ব মোট ব্যয়ের মাত্র ৩০ শতাংশ জোগায়। ফলে ফিলিস্তিনি প্রশাসন সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ ও নির্ভরশীল অবস্থায় থাকে।’
গাজা যুদ্ধ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হয় হামাসের হামলায় ইসরায়েলে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে। প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েল গাজায় অব্যাহত বোমাবর্ষণ চালায়। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত ফিলিস্তিনে ৬৭ হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয় এবং অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়।